সোমবার, ০১ Jun ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন
বিশেষ প্রতিবেদক।।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ রোডে ইয়াবা সিন্ডিকেটের যাত্রীবাহি কার বেড়েছে, তবে কমেছে ভাড়া। আর এসব কার গাড়ী যোগে পাচার হচ্ছে ইয়াবার চালান। সোমবার দুপুরে ডিবি পুলিশের অভিযান ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ চালক ও কার গাড়ী আটক হওয়ার পর লাইন পরিচালনাকারী জহির গা ঢাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, কক্সবাজারের ব্যস্ততম ডলফিন মোড়ে প্রধান সড়ক ও কলাতলি সি-বিচ রোডের দুই পাশে অবৈধ কার পার্কিংয়ের জন্য যানজট লেগেই আছে। ১৫০টি কার (ব্যক্তিগত গাড়ি হিসেবে দেখিয়ে) কক্সবাজার- টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে যাত্রীবহনে অবাধে চলাচল করছে। ব্যক্তিগত হিসেবে লাইসেন্স নেওয়া ও মেয়াদোত্তীর্ণ এই কারগুলোর প্রত্যেকটিই বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। শুধু যাত্রী পরিবহণই নয় অভিযোগ উঠেছে ইয়াবা পাচারেরও এসব কার ব্যবহৃত হচ্ছে।
গত ২৭ জুন মেরিন ড্রাইভ সড়কের বেলি হ্যাচারী পুলিশ চেকপোস্টে ডিবি পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ২০ হাজার পিস ইয়াবাসহ জহিরের নিয়ন্ত্রিত লাইনের কার গাড়ী আটক হওয়ার পর বেবিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। কেউ কেউ বলছে, লাইন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে ইয়াবার তথ্য ফাঁস করার ঘটনাও হচ্ছে।
এছাড়াও দৈনিক লাইন খরচ ও ভর্তি ফির নামে মাসে অন্তত ২৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে যাত্রীবাহি এই কারগাড়ী গুলোকে ঘিরে।
কলাতলি ডলফিন মোড়ে কয়েকটি বিভাগসহ রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গিয়ে ওঠানো এসব টাকা বিভিন্ন ভাবে মাসিক ভাগবাটোয়ারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
কক্সবাজার শহরের কলাতলী ডলফিন মোড় এবং টেকনাফ স্টেশনে বাসস্ট্যান্ড সৃষ্টি, কথিত লাইন তৈরি, সিন্ডিকেট কর্তৃক প্রতিটি গাড়ি থেকে দৈনিক ৫০০ টাকা হারে রাজনৈতিক দলের নেতা, পরিবহণ নেতাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা আদায়, দায়হীন গাড়ি চালাতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা এবং কৌশলে ইয়াবা পাচারের চিত্র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
জানা গেছে, কার গাড়ি প্রতি ৫শ টাকা করে চাঁদা আদায় করে থাকে গুপ্ত ওই সিন্ডিকেট। যার মধ্যে ৩শ টাকা নেওয়া হয় টেকনাফের উদ্দেশ্য কক্সবাজার ছেড়ে যাওয়া প্রাক্কালে কলাতলি ডলফিন মোড়ে এবং অবশিষ্ট ২শ টাকা নেওয়া হয় টেকনাফ ছেড়ে আসার প্রাক্কালে টেকনাফ স্টেশনে। চাঁদা আদায়ের এই দৃশ্য কলাতলী ডলফিন মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কারগুলো দিকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেই সহজেই দেখা মেলে।
কলাতলি ডলফিন মোড়ে জহির নামের এক ব্যক্তি বাহার উল্লাহর কাছ থেকে গত কিছুদিন আগে মহড়া চালিয়ে দোয়েল কার সার্ভিস লাইন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ওই জহির কয়েকজন রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদা উত্তোলন করছে। একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ও সহযোগী সংগঠনের কয়েক জেলা নেতার পৃষ্ঠপোষকতায় এই সব চাঁদাবাজি চলে আসছে মাসের পর মাস। এটা অনেকটাই প্রকাশ্যে চলছে। কিন্তু দেখার কেউ নেই।
অভিযোগে জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ লাইনে ভর্তির নামে প্রতিটি কারের মালিকের কাছ থেকে এককালীন ভর্তি ফি ২০ হাজার টাকা অফেরত যোগ্য নেওয়া হয়। দৈনিক ও এককালীন আদায়কৃত টাকার বিপরীতে দেওয়া হয়না কোনো রশিদ কিংবা অর্থ লেনদেনের কোনো দালিলিক প্রমাণ।
কক্সবাজার কলাতলি-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের কার যাতায়াতের লাইন সৃষ্টিকারী অঘোষিত মালিক বাহার উল্লাহ এবং সাবেক গাড়ি চালক বেলাল ও লাইন পরিচালক জহির ।
এক্ষেত্রে বাহার উল্লাহর দাবি-তিনি এখন লাইনের মালিক নন। তার কাছ থেকে দোয়েল কার সার্ভিস লাইন ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই রাজনৈতিক দলের কিছু প্রভাবশালী লোক মিলে এসব লাইন চালাচ্ছে। টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে চলাচলকারী দোয়েল কার সার্ভিস ও ট্যুরিস্ট কার সার্ভিস নামে পৃথক দুটি লাইন চলছে। কার সার্ভিস লাইট দুটি কক্সবাজার ও টেকনাফের ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জড়িত রয়েছে। তাদের ইশারায় মূলত এই লাইন পরিচালিত হচ্ছে।
কয়েকজন গাড়ির মালিক ও চালক জানিয়েছেন, সম্প্রতি ইয়াবা সিন্ডিকেটের গাড়ি কক্সবাজার- টেকনাফ সড়কে বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া কমে গেছে। আগে দিনে লাইনে ৫/৬ বার আসা-যাওয়া করা যেত। আর এখন গাড়ি বেশির কারণে ২ বার যাওয়া আসা করা যায়।
এই সড়কে গাড়ি চালায় এমন একাধিক চালক জানিয়েছেন-গাড়ি চালাতে গিয়ে কেন তাদের এই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয় তারা কেউ জানেন না। গোপনে বিভিন্ন খাতে ও নেতাদের টাকা দিয়ে এই লাইন চালু রাখতে হয়েছে এমন দাবি করেই নাকি তাদের কাছ থেকে এই টাকা নেওয়া হয়ে থাকে।
তারা আরও জানিয়েছে, সীমাবদ্ধ যাত্রী, সময়, তেল-গ্যাস খরচ এবং বাড়তি খরচের বোঝা মাথায় চেপে কোনোভাবেই এসব গাড়ির মালিক তাদের বিনিয়োগকৃত টাকা তুলে আনতে পারার কথা নয়।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, প্রতিটি গাড়িতে অনধিক ৪ জন যাত্রী বহন করা যায়। কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যেতে প্রতিজন যাত্রীর থেকে ভাড়া হিসেবে নেওয়া হয় ৩০০ টাকা। এভাবে প্রতি যাত্রায় ১২’শ টাকা তাদের আয় হয়। দূরত্ব হিসেবে গাড়িগুলো দৈনিক ৪ বারের বেশি যাতায়াত করা সম্ভবও নয়।
অন্যদিকে, খরচ দেখা যাচ্ছে-লাইন ভাড়া ২’শ টাকা। তার সাথে ড্রাইভারের বেতন ৫’শ টাকা। আবার প্রতি ট্রিপে জ্বালানি খরচ হয় কমপক্ষে ১ হাজার টাকা (আসা যাওয়া) । এভাবে সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়ায় ১৮’শ টাকা। তাদের আয় হয় আসা ও যাওয়া মিলে ৪’শ টাকা। গাড়িগুলোর মাসিক কিস্তি পরিশোধ করতে হয় ২৫ হাজার টাকা করে। তাহলে বাকি আরও ৭ হাজার টাকা কীভাবে পরিশোধ করেন তারা-এমন প্রশ্ন এখন সচেতন মহলে। এই বাড়তি টাকার আয়ের উৎস কি? তাদের নির্ধারিত সময় ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটে দ্রুত গতিতে চলে যায়। এতে অনেক দুর্ঘটনার জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কারগুলো তাদের খরচ তুলে আনতে তৃতীয় ট্রিপে রাতের বেলা টেকনাফের বিভিন্ন ইয়াবা অধ্যুষিত গ্রামে অবস্থান করে। সেখানে রাত কাটিয়ে সকালে নতুন ট্রিপ নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসেন বলে জানা যায়। ইতোপূর্বেও এধরনের অনেক কারগাড়ী ইয়াবাসহ আটক হয়েছে।
এদিকে, সোমবার (২৭ জুন) দুপুর এক টার সময় কক্সবাজার কলাতলী রোডের মেরিন ড্রাইভ সড়কে বেলি হ্যাচারী পুলিশ চেকপোস্টে কার গাড়ী ( ঢাকা মেট্রো ল-১২-০০৮৬) তল্লাশি করে। এসময় প্রাইভেট কারের চালক টেকনাফ থানাধীন গোদার বিল এলাকাবাসিন্দা মৃত অলি উল্লাহর ছেলে করিম উল্লাহ (৩২) কে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। প্রথমে সে ইয়াবার বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে আটককৃত করিম সহ প্রাইভেট কার কলাতলি সেভেন স্টার ওয়ার্কসপে এনে মেকানিকের সহায়তায় গাড়ীর বিভিন্ন অংশ খুলে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি করে ২০ হাজার পিচ ইয়াবা উদ্ধার করে জব্দ করা হয়।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) শাখার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলমের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ টিম এ অভিায়ান চালায়।
ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল আলম জানান, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মেরিন ড্রাইভ চেকপোস্টে একটি প্রাইভেট কার আটক করে তল্লাশি করি,প্রথমে আটককৃত চালক অস্বীকার করলেও স্থানীয় ওয়ার্কসপে চার ঘন্টা তল্লাশি করে ইঞ্জিনের নীচে বিশেষ কায়দায় রাখা অবস্থায় ইয়াবার সন্ধান পাওয়া যায়। পরে উপস্থিত লোকজনের সামনে ২০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক পাচারের নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করলেও আমাদের চোখ ফাঁকি দেয়া কঠিন বলে জানান তিনি।
ওসি আরও জানান, আটক গাড়িটা প্রাইভেট কারই,তবে মাঝে মধ্যে মাদক পরিবহনের আড়ালে টেকনাফ -কক্সবাজার রোডে (অনিয়মিত) যাত্রী বহন করে। এসব কার লাইন পরিচালনাকারীদের ব্যাপারেও নজরদারী বাড়ানো হয়েছে।
Leave a Reply