বিশেষ প্রতিবেদক।।
কক্সবাজার সদর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল উদ্দিন হত্যা মামলার প্রধান আসামি আজিজ সিকদার। বিএনপি রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনানের সাথে ছায়ার মতো থাকতেন। গত ৩ জুলাই এই আজিজ সিকদার ও তার বাহিনীর সদস্যরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেন ফায়সাল উদ্দিনকে।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের ছায়াতলে থাকা আজিজ সিকদারসহ এই চক্রের সদস্যদের কেউই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত নন এবং কেউ ছাত্রও নন। এরা কেউ বা বিএনপি, কেউ বা জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সেই ফায়সাল এই হত্যাকারীদের কাছ থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগ নেতা, ছাত্রলীগ নেতা ও পুলিশের সাহায্য চেয়েছিলেন। কেউ ফায়সালকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। বরং উল্টো মৃত্যুর মুখোমুখি করে দেন তারা।
সেইদিন রবিবার (৩ জুলাই) সন্ধ্যায় কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলন শেষে বাড়ি ফিরছিলেন ফায়সাল। পথিমধ্যে ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল উদ্দিনকে কূপিয়ে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, পুলিশের উপস্থিতিতেই সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে ফয়সাল কে হত্যা করেছে।
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে একইদিন রাতে কক্সবাজার শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে জেলা ছাত্রলীগ। বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনান।
তিনি ওই সময় বক্তব্যে বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতেই ছাত্রলীগের নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে, এ ঘটনায় জড়িত প্রধান আসামী বিএনপি নেতা আজিজ সিকদার জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনানের ছায়াতলে থাকতেন। এই মারুফ আদনানের সাথে তোলা ফয়সাল হত্যা মামলার প্রধান আসামি আজিজ সিকদারের ঘনিষ্ঠ ছবি ৬ জুলাই রাতে ফেসবুকে শেয়ার করেন সাংবাদিক শাহাদত হোছাইন। ছবিটি প্রকাশ হওয়ার পরপরই বিষয়টি সবার নজরে আসে। খুনীর সাথে জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক এমন সখ্যতা জানাজানি হওয়ার পর জেলা জুড়ে সমালোচনা শুরু হয়।
এদিকে, এমন ঘনিষ্ঠ ছবি ফেসবুকে শেয়ার করায় ওই সাংবাদিককে কল দেয় মারুফ আদনান। এরপর ওই সাংবাদিক কে হত্যা করার হুমকি দেয় মারুফ আদনানের বড়িগার্ডখ্যাত ফয়সাল আহমেদ প্রকাশ গুরু ফয়সাল। সে একজন পেশায় ছিনতায়কারী ও কিশোরগ্যাং লিড়ার। সে কক্সবাজার শহরের এন্ডারসন রোড এলাকার লাদেনের ছেলে। এরপর একই রাতে তার আরেক বড়িগার্ড ও ক্যামেরাম্যান খ্যাত ওয়াশিক আহমদও তাকে মারধর করার হুমকি দেন। এই ঘটনার পরের দিন (৭ জুলাই) জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরী করেন সাংবাদিক শাহাদত হোছাইন। যার জিডি নং-৪৮২।
অন্যদিকে, অনেকে মন্তব্য করেন, ছাত্রলীগ নেতার ছায়াতলে থেকে ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যার সাহস পেয়েছে। এই হত্যাকান্ডে মারুফ আদনানের পরিকল্পনা থাকতে পারে; এমন আশংকা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
অভিযুক্ত কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মারুফ আদনান দাবী করেন, আজিজ সিকদার তার বাল্যকালের বন্ধু। সে হিসেবে তার সাথে আমার একটি ছবি কেন; অনেক ছবি থাকতেই পারে।
পুলিশ জানায়, ৭ জুলাই ভোররাতে ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়াবাজার এলাকার একটি বাড়ি থেকে মুন্না ও রিয়াদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আগের দিন ৬ জুলাই র্যাব সদস্যরা গ্রেপ্তার করেন আজিজ সিকদার ও ফিরোজ আলমকে। র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে আজিজ সিকদার ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল উদ্দিনকে হত্যার দায় স্বীকার করে বলেছিলেন, তাঁর নেতৃত্বে হামলায় অংশ নিয়েছিল ১৫ থেকে ২০ জন। অটোরিকশা থেকে নামিয়ে ফয়সাল উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করতে সময় লেগেছিল ৫ থেকে ১০ মিনিট। ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল উদ্দিন হত্যা মামলার প্রধান আসামি আজিজ সিকদারসহ গ্রেপ্তার ৪ আসামিকে ১০ জুলাই চার দিনের রিমান্ডে আনেন পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে আসামি আজিজ সিকদার, ফিরোজ আলম, রিয়াদ সিকদার ও মুহাম্মদ মুন্না স্বীকার করেন স্থানীয় কলেজ ছাত্র নুরুল হুদা হত্যার প্রতিশোধ নিতে ফয়সালকে হত্যা করা হয়।
নিহত ফয়সালের বড় ভাই নাছির উদ্দিন বাদী হয়ে (৫ জুলাই/২২ ইং) আজিজ সিকদারসহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। যার মামলা নং-১৭/৪৪৩।
মামলার বাদী বলেন, আজিজ সিকদারের নেতৃত্বেই পরিকল্পিতভাবে তাঁর ছোট ভাই ফয়সালকে হত্যা করা হয়েছে। নুরুল হুদা হত্যার সঙ্গে ফয়সাল জড়িত ছিলেন না। থানায় দায়ের হওয়া সেই হত্যা মামলায় ফয়সালের নামও ছিল না।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, নিহত ফয়সাল উদ্দিন খুবই ভদ্র স্বভাবের ছেলে ছিলেন। তিনি বিবাহিত, তাঁর স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এলাকার প্রভাবশালী আজিজ সিকদারগং একটি হত্যা মামলায় ফাঁসাতে না পেরে ফয়সাল উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। তিনি ফয়সালের হত্যাকারীদের দ্রুত শাস্তি চান।
Leave a Reply