মো.শাহাদত হোছাইন।।
কক্সবাজার সদর মডেল থানা ও টেকনাফ মডেল থানার দুই ওসির রশি টানাটানিতে ২৫দিন পর লাশ হয়ে ঘরে ফিরলো অপহরণের শিকার ৩ বন্ধু। এই কারণে দুই থানার ওসিকে দোষছেন ও দায়ী করছেন নিহতদের পরিবার। স্বজনদের দাবী, তারা যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতো তাহলে লাশ হতে হতোনা তিন বন্ধু ইউচুপ, রুবেল ও ইমরানকে। র্যাবের সহযোগিতার কারণে অন্তত লাশগুলো ফেরত পাওয়ায়, তারা র্যাবকে ধন্যবাদ জানায়।
নিহত ইমরান সরকারের বাবা মো.ইব্রাহিম জানান, ২৮ এপ্রিল টেকনাফে সিএনজি করে হাবিরছড়া এলাকায় আমার ছেলেসহ তিনবন্ধু। সারারাত ফিরে না আসায় খুজতে থাকি। একদিন পর বাংলাবাজার এলাকার সিএনজি চালক গফুর তারাবনিয়ারছড়া এলাকার তার এক বন্ধু আনোয়ার হোছাইন মাসুদের মাধ্যমে অপহরণের খবর পাই। ওই খবরে ২৯ এপ্রিল রাতে মামলা করতে টেকনাফ থানায় ওসির কাছে যাই। ঘটনার শিকার তিন বন্ধু কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা বলে তিনি মামলা না নিয়ে পাঠান কক্সবাজার সদর থানায়। কক্সবাজার সদর থানায় যোগাযোগ করলে আমাদের পাঠায় টেকনাফ থানায় যেহেতু অপহরণের ঘটনাটি ঘটেছে টেকনাফে। এভাবে দুই থানায় আমাদের ৭ বার যাওয়া আসা হয়েছে। কিন্তু কক্সবাজার সদর থানা ৩০ এপ্রিল রাতে পৃথক ৩ টি জিড়ি নিলেও অপহৃতদের উদ্ধারে আর কোন ভুমিকা রাখেনি। দুই থানার ওসির রশি টানাটানিতে আমার ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করতে পারি নাই। পরে দুই কিস্তিতে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে ১০ এপ্রিল মামলা নেন টেকনাফ থানার ওসি-এমন অভিযোগ নিহতের বাবার।
নিহত ইমরানের মা জানায়, অপহরণ করে মুক্তিপণের ৩০ লক্ষ টাকা আদায়ের জন্য নির্যাতনের ভিডিও পাটায় আমাদের মোবাইলে। এগুলো ওসিদের দেখানো হলেও টেকনাফ থানার ওসিকে আমার স্বামী পায়ে ধরার পরও মামলা নেইনি। যতবার গেছে ততবারই ফেরত দিয়েছে। এদিকে অপহরণকারীদের ৩০ লক্ষ টাকা দেওয়ার আশ্বাসে আমরা বিলম্ব করতে থাকি। দুই কিস্তিতে ১ লক্ষ ১ হাজার টাকা বিকাশে দিয়েও আমার ছেলেকে জীবিত পাইনি। একমাত্র পুলিশ প্রশাসনের অবহেলাকে দায়ী করেন তিনি। ছেলেকে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর ত্রিপল মার্ডারের ঘটনায় ২ জনকে আটক করেছে র্যাব-১৫। এই বিষয়ে বৃহস্পতিবার (২৫মে) দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছে র্যাব-১৫ কক্সবাজার কার্যালয়। র্যাব জানায় অপহরণের বিষয়টি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে র্যাব তাদের জীবিত উদ্ধারে মাঠে নামে। গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এবং অপহরণকারীরা বার বার স্থান পরিবর্তন করায় তাদের জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কোন এক সময় পুড়িয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় তাদের। তারপরেও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তার একজনকে আটক করে লাশের সন্ধান পায় এবং উদ্ধার করি। এ ঘটনায় আটক দুইজনকে টেকনাফ থানায় হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানায় র্যাব-১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক সাইফুল ইসলাম সুমন।
আটকরা হলেন, টেকনাফ মোচনী ক্যাম্পের ব্লক-ই এর বাসিন্দা আবু সামাদের ছেলে সৈয়দ হোসেন প্রকাশ সোনালী ডাকাত (৩০) এবং টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোদারবিল ৬নং ওয়ার্ডের মৃত আব্দুল করিমের ছেলে এমরুল করিম প্রকাশ ফইর (৩০)।
অন্যদিকে, ওই ঘটনায় নিহত জমির হোসেন রুবেলের বোন মিনু আরা বেগম বাদী হয়ে ১০মে টেকনাফ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-৩৫। এর তিন দিন পর (১৩মে) মামলার দুই আসামীকে আটক করেছে টেকনাফ মডেল থানা পুলিশ।
তারা হলেন, টেকনাফ মোচনী রেজিঃ ক্যাম্পের আবু তাহেরের ছেলে শফি আলম প্রকাশ বেলাল (২৮) ও আবদুল মতলবের ছেলে আরাফাত (২২)। শফি ও আরাফাত সম্পর্কে মামা-ভাগিনা। তাদের হেফাজত হতে মৃত রুবেলের ব্যবহৃত মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। আসামী শফি আলম তার এক আত্মীয় কোহিনূর নামক একজন মেয়েকে দেখার টোপ দিয়ে নিহত রুবেল ও তার দুই বন্ধুকে ডেকে আনে।
টেকনাফ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: আবদুল হালিম জানান, জিড়ির কোন কপি স্বজনদের কাছ থেকে বা কক্সবাজার সদর থানার পক্ষ থেকে না পাওয়ায় মামলা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ৯ এপ্রিল জিড়ির কপি পাওয়াতে ১০ এপ্রিল মামলা রুজু করেছি। ঘটনার এতদিন পর মামলা নিলেন কেনো এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এডিয়ে যান। নিহত ইমরানের পিতা ছেলেকে জীবিত উদ্ধারে কাকুতি-মিনতি করে পায়ে ধরার পরও মামলা নেননি এবং অপহৃতদের জীবিত উদ্ধারে কোন ভুমিকা রাখেননি এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, উনাকে তিনি নিজের চোখে একবারের জন্যও দেখেননি। হয়ত তিনি কারো সাথে কথা বলেছেন। ৩০ হাজার টাকা নিয়ে মামলা রুজু করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
টেকনাফ থানা পুিলশ লাশের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহতদের পরিবারের কাছে লাশগুলো হস্তান্তর করে এবং স্বজনরা লাশগুলোর দাফন সম্পন্ন করেন।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রফিকুল ইসলামের মোবাইলে একাধিক বার কল দিয়েও মোবাইল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ভিকটিমদের স্বজনরা আমার কাছে আসছে। তাদের কথা মনোযোগ সহকারে শুনে, টেকনাফ থানার ওসি ও সদর মডেল থানার ওসিকে দিকনির্দেশনা দিই। তারা সেই মোতাবেক কাজ করছে। টেকনাফ থানার ওসির কাছে ভিকটিমদের পরিবার বহুবার গিয়েছে এবং মামলা নেওয়ার জন্য পায়েও ধরেছে। তারপরও ১২ দিনেই মামলা না নেওয়ায় তারা কোন প্রতিকার পায়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ হয়তো ঘটনার বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝাতে পারেনি কিংবা কোন না কোনভাবে বিষয়টি অন্যদিকে ডাইভার্ট করতে চেয়েছে, তাই এমন হতে পারে। দাবীকৃত টাকা ওসিকে দিতে পারেনি তাই প্রথমে মামলা নেয়নি। পরে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে মামলা নিয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ তডিৎ প্রতিকার না পেলেই ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তুলেন। যদি টাকা দিয়ে মামলা হয়েছে বাদী বা কেউ দাবী করেন, তাকে আমার কাছে পাঠান আমি ব্যবস্থা নিবো।
উল্লেখ্য, কক্সবাজারের টেকনাফে পাত্রী দেখতে গিয়ে অপহরণের শিকার হয় তিন বন্ধু। অবশেষে ২৫ দিন পর ওই তিন বন্ধুর মৃতদেহ উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। বুধবার (২৪ মে) দুপুরে টেকনাফ দমদমিয়াস্থ গহীন পাহাড় থেকে গলিত ৩ মৃতদেহ উদ্ধার করে র্যাব এবং পুলিশের দুইটি টিম।
উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলো হলো- কক্সবাজারের আ উপজেলার জালালাবাদ সওদাগরপাড়া এলাকার মৃত নুরুল কবিরের ছেলে মোহাম্মদ ইউসুফ (৩০), কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদন্ডী এলাকার মোহাম্মদ আলমের ছেলে জমির হোসেন রুবেল (২৮) এবং কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া এলাকার মো.ইব্রাহিমের ছেলে ইমরান সরকার(২৮)।
Leave a Reply