ইমরান জাহেদ।।
২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট বিশাল রোহিঙ্গা জন
-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ-শিশু আশ্রয় নেয় উখিয়া টেকনাফের রক্ষিত বনাঞ্চলে। এসময় রোহিঙ্গাদের সেবার অজুহাতে প্রায় ২শতাধিক এনজিও বিভিন্ন সেবামূলক কাজ শুরু করে ক্যাম্পসমুহে। লোকবল সংকটের অজুহাত দেখিয়ে এসময় শত-শত স্থানীয়দের চাকুরী দেওয়ার ফলে এলাকায় একটি উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। গত কয়েক বছর ধরে স্বার্থন্বেষী চক্র এনজিও সংস্থা সমুহে তাদের আত্মীয় স্বজনদের চাকুরীতে নিয়োগ দিয়ে স্থানীয়দের কোন প্রকার অজুহাত ছাড়াই চাকুরীচ্যুত করে। যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। আতংকে রয়েছে বিভিন্ন ক্যাম্পে এনজিওতে কর্মরত স্থানীয় চাকুরীজীবিরা।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, গত ৪ বছরে ৬০ শতাংশ শিক্ষিত নর-নারী চাকুরী হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। বিপর্যস্ত এসব চাকুরীচ্যুতদের অনেকেই বিপদ গামী হয়ে অসামাজিক ও অনৈতিক কাজে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় চাকুরীচ্যুত যুবক আবছার উদ্দিন জানায়, উপযুক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার বলে এনজিওতে চাকুরী হয়েছিল। প্রায় ২ বছর চাকুরীকালীন তার পরিবার স্বচ্ছলভাবে জীবন জীবিকা কাটাতে সক্ষম হয়েছে। চাকুরীর বেতনে অনেক সমস্যাও সমাধান করেছে। ভবিষ্যতের আশা করে অনেক পরিকল্পনা
ও তার ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এনজিও সংস্থা একদিনের নোটিশে তাকে চাকুরীচ্যুত করে দেওয়ায় সে এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এদিকে, তার বিয়ের দিন তারিখ ঠিকঠাক হয়েও চাকুরী না থাকায় এখন বিয়েটিও হচ্ছে না।
চাকুরীচ্যুত আমেনা বেগম জানায়, এনজিওতে প্রায় আড়াই বছর চাকুরী করে সংসারের হাল ধরেছিলেন। অনেক গুলো সমস্যার কেটে উঠে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। চাকুরীজীবি হওয়ার সুবাদে বর পক্ষের অনেকেই তাকে প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু আর কিছু দিন চাকুরী আশা করে সে তার ওই প্রস্তাবগুলো ফিরিয়ে দিয়ে জীবনে বড় ভুল করেছে বলে আক্ষেপ করে জানান।
এদিকে, এনজিও কোন দোষ-ত্রুুটি ছাড়া গণহারে চাকুরীচ্যুত করছে। এতে অনেকেই বিপদগামী হচ্ছে। চাকুরীহীন হয়ে বেকার অবস্থায় হন্য হয়ে ঘুরছে। টাকা না পেয়ে ইয়াবা বাণিজ্যের মত জঘন্যতম অপরাধ প্রবণতার দিকে ধাবিত হয়েছে বাধ্য হয়ে।
স্থানীয়রা জানান, এনজিওদের বিরুদ্ধে দূর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয়দের চাকুরী নিশ্চিত করে বহিরাগতদের বিতাড়িত করতে হবে। তা নাহলে আমাদের ভবিষ্যতে আরো বড় ধরনের দুঃখ ভোগ করতে হবে।
ফলিয়াপাড়া গ্রামের চাকুরীচ্যুত সুইটি বলেন, সে এনজিওতে চাকুরী পাওয়ার পর তার পরিবারটা সাজিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এ সুইটি চাকুরীর বেতন দিয়ে ভাই-
বোনদের পড়ালেখা, পিতা-মাতার চিকিৎসা খরচের যোগান দিয়েছে। ভবিষ্যতে সংসার জীবনে পা বাড়ানোর মনোবাসনা নিয়ে নিয়মিত চাকুরী করে আসছিল। কিন্তু পাষন্ড ও বর্বর এনজিও তাদের দুঃখের কথা একটুও শুনল না। ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হলো তাদের আত্মীয়-স্বজনদের।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম.গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গার ভারে বেশি জর্জরিত পালংখালী ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের প্রতিটি মানুষ রোহিঙ্গা কর্তৃক নির্যাতিত। অথচ এখানকার ছেলে-মেয়েরা চাকুরী পাচ্ছে না। এনিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে এনজিওরা হুমকি-ধমকি প্রদর্শন করছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটি বেশ কয়েকবার আন্দোলন করে কিছু কিছু স্থানীয়দের চাকুরীতে নিয়োগ দিলেও পরবর্তীতে তাদেরকে বিনা অজুহাতে ছাঁটাই করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, উখিয়া টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় চাকুরীজীবিদের কোন প্রকার অজুহাত ছাড়া চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে। চাকুরীচ্যুত এসব ছেলে মেয়েদের মানসিকভাবে একটি সুন্দর পরিবেশে রাখতে হলে তাদেরকে অবশ্যই ক্যাম্পে চাকুরী দিতে হবে।
উখিয়া প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে উখিয়া উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, রত্নাপালং ইউপি চেয়ারম্যান খাইরুল আলম চৌধুরী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থানীয়দের চাকুরী নিশ্চিত করার দাবী জানিয়ে বলেন, প্রয়োজন হলে এনিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
প্রেসক্লাবের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, যেকোন কিছু আদায় করতে হলে তার আচার- আচরণ হতে হবে নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী। স্থানীয় রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ সবাইকে ঐক্যমতের ভিত্তিতে এনজিওদের সাথে পরামর্শ করে চাকুরী নিশ্চিত করতে হবে।
Leave a Reply