সোমবার, ০১ Jun ২০২৬, ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিবেদক।।
দুইদিন ব্যাপী শুরু হয়েছে কক্সবাজারের ডিসি সাহেবের ৬৮তম আসরের বলি খেলা ও বৈশাখী মেলা। বিভিন্ন কারণে ঐতিহ্যবাহি বলী খেলাটি দিন দিন জৌলুস হারাচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে প্রতিটি আসরে অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা ও প্রকাশ্যে জুয়ার আসর সহ নানা কারণে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বলী খেলায় আগত দর্শনার্থীরা জানায়, বলি খেলা ও বৈশাখী মেলার প্রথমদিনেই হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়েছে। দুপুর থেকে দর্শকরা ১০০ ও ৫০ টাকায় টিকিট কেটে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে হাজির হয়। স্টেডিয়ামের ৩/৪টি গেইট দিয়ে মাঠে প্রবেশ করে বলি ও বলিদের শতশত অনুসারীরা। এছাড়া, প্রধান গেইট দিয়ে প্রবেশ করে ভিআইপিরা। বিকাল ৪ টার দিকে অতিথিরা আসন গ্রহণ করলে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। উপস্থাপনার দায়িত্ব নেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জসিম উদ্দিন। প্রথমে স্বাগত বক্তব্য রাখেন- ডিসি সাহেবের বলি খেলা ও বৈশাখী মেলার আহবায়ক এডিসি বিভীষণ কান্তি দে। সময়ের সংক্ষিপ্ততার অযুহাত এনে প্রথমে বক্তব্য রাখতে নাম ঘোষণা আসে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী, এরপর বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল ইসলাম, এএসপি রফিকুল ইসলাম, নৌকা প্রতিকের মেয়রপ্রাথী মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ও সবশেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখেন স্থানীয় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল এমপি। সিনিয়র জুনিয়র না মেনেই বক্তব্য দেন অনেকে। এরপর শুরু হয় বলী ধরার পালা। যে যার মতো করে ৯-১০টি জুঁটি ইচ্ছেমতো ‘বলি ধরা’ চলছে। এতে হিসেব নেই কে আম্পায়ার ও কারা বিচারকের দায়িত্ব পালন করবে। বলিরা খেলা খেলে, টোকেন নিয়ে হ-য-ব-র-ল ভাবে এদিক-ওদিক দৌঁড়াদৌঁড়ি করে পরে ২শ টাকা করে নগদ টাকা পুরস্কার নেন। অনেকে কয়েকবার টোকেন নিয়েছে এবং কয়েকবার টাকাও নিয়েছে। বলিদের সাথে মাঠে নামা সহযোগী ও ভিআইপিদের দখলে চলে যায় পুরো খেলারমাঠ। শুরু হলো মাঠ জুড়ে হৈইহুল্লোড- চিল্লাচিল্লি ও হ-য-ব-র-ল অবস্থা। গ্যালারীর দর্শকরা চিল্লাচিল্লি করলে পুলিশ মাঠের ভিআইপি দর্শকদের লাইনে আনার চেষ্টা করও বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ব্যর্থ হয়েছে আয়োজক কমিটিও। এমতাবস্থায় খেলা না দেখে বের হয়ে যায় শতশত দর্শক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঐতিহ্যবাহী ডিসি সাহেবের বলী খেলায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য বলী স্টেডিয়ামের ফটকে আটকে দেয়। এতে অনেকে হয়রানির শিকারও হয়। পরে স্টেডিয়ামের মাঠে যেখানে বলীরা খেলায় অংশ নেয় সেখানে দেখা দেয় নানা বিশৃঙ্খলা। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে বলীরা অংশ নিলেও পুরস্কৃত করা হয় ২০০ টাকায়। এনিয়ে অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক বলী জানান, দূর-দুরান্ত থেকে আগত বলীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এই নিয়ে এসব বলীরা জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তাদের যেমন বিষদাগার করেছেন, তেমনি ডিসি সাহেবের বলী খেলা জৌলুস হারানোর কথাও বলছেন তারা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর কয়েক জোড়া বলী খেলায় অংশ নিলেও দেখা মিলেনি আলোচিত কোন বলীর।
এদিকে, শুক্রবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত ৬৮ তম আসরে মসজিদের সামনে জুয়ার আসর নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। জুমার দিনে মসজিদের সামনে প্রকাশ্যে জুয়ার আসরের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিক বন্ধ করে দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৮ মে বৈশাখী মেলা ও ১৯-২০ মে কক্সবাজার শহরের বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম ও তার পাশের এলাকায় শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে ডিসি সাহেবের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলার নানা আয়োজন। শুক্রবার দুপুর থেকে প্রকাশ্যে বসে জুয়ার আসর। আয়োজক প্রতিষ্ঠান জেলা ক্রীড়া সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তার উদ্যোগে স্টেডিয়ামের বাইরে অন্তত ১২ টি জুয়ার আসর দেখা গেছে।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিভীষণ কান্তি দাশ জানান, দুই দিনের এ আসরে নাগরদোলা, হস্তশিল্প, কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, বস্ত্র শিল্প, মৃৎ শিল্প ও দেশীয় সংস্কৃতির নানা পণ্যের সমাহার বসবে মেলায়। থাকবে না কোন প্রকার জুয়ার আসর। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো।
শুক্রবার দুপুরে জুয়ার আসরের বিষয়টি নিয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিভীষণ কান্তি দাশের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বিকাল ৪ টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই ঘটনাস্থলে যান। ওই সময় তিনি আশে-পাশে থাকা সকল জুয়ার আসর বন্ধও করে দেন। জুয়া খেলা আবার চালু করলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কক্সবাজার রামু আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল বলেন, বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা হওয়া ভাল। এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। এটি ধরে রাখতে হবে। খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে হবে। কিন্তু এটাকে পুঁজি করে জুয়া বা অশ্লিলতা মেনে নেয়া হবে না।
Leave a Reply